শনিবার, ১৬ অক্টোবর ২০২১, ৩:২৮ pm

শিল্পী সৈয়দ ইকবালের টরন্টো স্টুডিও পরিদর্শনে হাইকমিশনার ড. খলিল রহমান


শিল্পী সৈয়দ ইকবালের টরন্টো স্টুডিও পরিদর্শনে হাইকমিশনার ড. খলিল রহমান

স্টুডিওতে অতিথিবৃন্দ...ছবি/অনুপম দাশ

বাংলাদেশের মাননীয় হাইকমিশনার ড. রহমান গত ১ অক্টোবর শুক্রবার শিল্পী সৈয়দ ইকবালের চিত্রকর্ম দেখতে তার টরন্টো স্টুডিও পরিদর্শন করেন। সঙ্গে ছিলেন টরন্টোর সর্বাধিক পঠিত বাংলা সাপ্তাহিক বাংলামেইল সম্পাদক ও এনআরবি টিভির সিইও শহিদুল ইসলাম মিন্টু, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সমাজসেবক সারওয়ার রহমান ও রিয়েলটর শেখ ইউসুফ।

 

আগামী ১৮ নভেম্বর গ্রেটার টরন্টোর মিসিসাগা আর্ট গ্যালারীতে উদ্বোধন হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ পূর্তি উপলক্ষ্যে একটি মাইল ফলক চিত্র প্রদর্শনী। প্রদর্শনীটি কিউরেট করবেন টরন্টোর সাউথ এশিয়ান আর্ট স্পেশালিস্ট খ্যাত আলি আদিল খান। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি নিয়ে এরকম আয়োজন দেশের বাইরে এই প্রথম। যদি ঠিকঠাক ভাবে সব হয় তাহলে ব্যাপারটি হবে ঐতিহাসিক।  বাংলাদেশের প্রধান সব শিল্পীদের ছবি ও বাংলাদেশী কানাডিয়ান প্রধান শিল্পীদের চিত্রকর্ম থাকছে এই প্রদর্শনীতে। বাংলাদেশের শিল্পকলা একাডেমিতে দারুণ সফল ও ব্যয়বহুল প্রদর্শনী  ছিলো ‘লাইটিং দি ফায়ার অব ফ্রিডম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’। এই আয়োজনের উদ্বোধন করেছিলেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ রেহানা। সঙ্গে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কন্যা  সায়মা ওয়াজেদ পুতুল। প্রদর্শনীটির আয়োজক ছিলেন বিশ্বখ্যাত ‘ঢাকা আর্ট সামিট’ এর রাজীব ও নাদিয়া সামদানী। এবার তারাই মিসিসাগা আর্ট গ্যালারীতে প্রদর্শনীটির আয়োজক। এই আয়োজনে মিডিয়া পার্টনার কানাডার প্রথম চব্বিশ ঘন্টার বাংলা টেলিভিশন চ্যানেল এনআরবি টিভি।

 

মিসিসাগা আর্ট গ্যালারীর আগামী প্রদর্শনীতে শিল্পী সৈয়দ ইকবালের ক্লাইমেট চেঞ্জ থিম নিয়ে আঁকা বিশাল ছবি ‘টিয়ার্স অব নেচার-১২২’ থাকবে ( ১৮x৬ ফুট)। ক্লাইমেট চেঞ্জ, গ্লোবাল ওয়ার্মিং বাংলাদেশকে সর্বনাশ করছে দুইভাবে। নিচের দিকে বঙ্গপোসাগর গিলে নিচ্ছে জমি, আর মধ্যভাগে নদী শুকিয়ে হচ্ছে মরুভূমি । এরই প্রতিফলন ছিলো 'প্রকৃতির কান্না-১২২' ছবিটিতে।

 

প্রদর্শনী কিউরেটার আলি আদিল খান শিল্পী সৈয়দ ইকবালের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হওয়াতে তিনি অনুরোধ করলেন মুক্তিযুদ্ধকে বিষয় করে ‘গুয়ের্নিকা’র ধারার সহজ সরল একটা নতুন ছবি আঁকতে। যা দেখে শিশু থেকে বৃদ্ধ, কিংবা ছবি সমঝদার থেকে সাধারণ সবাই মুহূর্তে বুঝতে পারে। আবার সবাইকে বিষয়টি যেন ভাবায়। সৈয়দ ইকবাল বললেন, তখনি আমার মাথায় কড়া নাড়ে শৈশবের স্মৃতি। শৈশবে দেখা পথে পথে গলিতে ঘাড়ে বাক্স নিয়ে ঘোরা সিনেমাওয়ালাদের কথা। এক আনা দিলে বাক্সে গোল-গোল খোপের ঢাকনা খুলে মুখ-চোখ লাগিয়ে ভেতরে একের পর এক ঘুরন্ত ছবি দেখা যেত। সিনেমাওয়ালা হাতল ঘুরিয়ে ছবি রোল করতেন আর আর পুঁথি গানের মত সুর করে ছবির বিস্তারিত বলতেন। সেই সহজ সরল ধারায় মুক্তিযুদ্ধের প্রধান ঘটনা ক্যানভাসে আনতে চেষ্টা শুরু করি।

 

১২x৬ ফুট ক্যানভাসে এ্যাক্রিলিক রং দিয়ে আঁকা। একেবারে নিচের দিকে পঁচিশে মার্চে নিরীহ মানুষ হত্যা। রক্ত মাখা লাশের সারি এলো মেলোভাবে পড়ে থাকা। এরপরের সারিতে একপাল দাঁতাল শূয়োর। দাঁতে রক্ত মাখা, মাথায় পাকিস্তানী আর্মির হেলমেট। এরপরের সারি ১৬ ডিসেম্বরের বিজয়। সারি-সারি অস্ত্র হাতে মুক্তিযোদ্ধা আর ভারতীয় সৈন্য বাহিনীর কাছে অসহায়ভাবে পাকিস্তানী বাহিনীর পরাজয়। ছবির ঠিক মধ্যিখানে যীশুর মত ক্রশে আঁটকে আছেন বঙ্গবন্ধু। তাঁর দুই হাত দুই দিকে মেলে দেয়া, তালুতে পেরেক দিয়ে আঁটকানো, রক্তে রঞ্জিত। মুখে রয়েল বেঙ্গল বাঘের মত গর্জন। নয়টি মাস তাঁর প্রিয় বাংলার জনতা থেকে তাঁকে দূরে রাখার ক্ষোভ। মন পড়ে আছে তাঁরই এক কথায় মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়া প্রাণপ্রিয় বাঙালির প্রতি। আর শরীর আঁটকে আছে, প্রতিক্ষণ তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র হচ্ছে। তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে বন্দি। তারই প্রতীক দন্ডায়মান এই মহাপুরুষ।  ঠিক তাঁর  নিচে, তাঁর ডান হাত খ্যাত বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ। হাত উঁচিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের নির্দেশ দিচ্ছেন – কিল্ড দ্যাম অল ওয়াইল্ড পিগ!

 

তাউদ্দিনের ডানে-বাঁমে বাংলাদেশ ও ভারত, দুই দেশের যুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল ওসমানী ও মানিক শ। ক্রসে দাঁড়ানো সাদা পাঞ্জাবীর ওপর কালো মুজিবকোট পরা বঙ্গবন্ধুর পেছনে আকাশ রক্তবর্ণ লাল। এক সাগর রক্ত শুধু নয়, যেন এক আকাশ রক্ত। বাঁয়ে আকাশে উড়ন্ত  ড্রাগনরূপি শকুন, সঙ্গে জুলফিকার আলি ভুট্টো। ডানে তখনকার মুক্তিযুদ্ধকালে শান্তির সাক্ষাৎদেবী যাকে বলা হত সেই ইন্দিরা গান্ধী, পায়রারূপে উড়ে আসছেন, সঙ্গী শান্তির কপোত। বঙ্গবন্ধুর মেলে দেয়া দুই হাতের পেছনে ক্রুসের কাঠে বসা ডানে-বামে তিনটি করে ছয়টি পায়রা, ঐতিহাসিক ছয় দফার প্রতীক।

 

ছবিটি খুবই সারল্যের সঙ্গে আগুনরঙে আঁকা। সববয়সের সর্বস্তরের মানুষ যাতে নিমিষে বুঝতে পারে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, আকাশছোঁয়া বিশ্বব্যক্তিত্ব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার সহযোগীদের।

 

কিউরেটার আলি আদিল খানের মুখে এরকম একটি ছবি আঁকা হচ্ছে শুনে কানাডাস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনের মাননীয় হাইকমিশনার ড. খলিল রহমান স্বশরীরে দেখতে আসতে দেরী করেননি । শিল্পী সৈয়দ ইকবালের স্টুডিওটি পরিদর্শন করে ছবিটি নিজের চোখে ছবিটি দেখার পর তাঁর প্রতিক্রিয়া ছিলো মুগ্ধতার ও আনন্দের।

 

বললেন, আমাদের মত যারা সরকারী চাকরী করি কাজের চাপে ছবি বা ধ্রুপদ সংগীত নিয়ে বোঝাপড়া হয়ে ওঠে না। আমার ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম কিছুটা এজন্যে যে, দেড় দশক আগে দিল্লীতে বাংলাদেশ দূতাবাসে তখনকার আমার বস হাইকমিশনার ফারুক সোবহান শুধু ছবি বোঝার জন্যে এক মাসের ক্লাশে পাঠিয়েছিলেন দিল্লী মডার্ণ আর্ট মিউজিয়ামের সর্বেসর্বা মিসেস সেনের কাছে। তখন বিরক্ত হলেও এখন বুঝি বাংলাদেশের এই নামী আর্ট কালেক্টর আমার কত বড় উপকার করেছিলেন। তাই চিত্রকলার প্রতি আমার সীমাহীন আগ্রহ।

 

তিনি সৈয়দ ইকবালের বড় দুইটি ছবি ক্লাইমেট চেঞ্জ নিয়ে ‘টিয়ার্স অব নেচার-১২২’ ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে ‘ফাদার গিভ আস এ নিউ নেশান’ খুবই পছন্দ করলেন। কিছু মূল্যবান পরামর্শও দিলেন যাতে ছবিটি আরো অর্থবহ হয়। এইসময় উপস্থিত বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সারওয়ার রহমান ও রিয়েলর শেখ ইউসুফেরও ছবি দুইটি পছন্দ হয়।

 

হাইকমিশনার ড. খলিল রহমান কানাডার বহুল পঠিত সাপ্তাহিক বাংলামেইল সম্পাদক ও এনআরবি টিভির সিইও শহিদুল ইসলাম মিন্টুকে ধন্যবাদ জানান শিল্পী সৈয়দ ইকবালের প্রতিটি প্রদর্শনীতে সার্বিক সহযোগীতা করার জন্যে। তিনি মিসিসাগা আর্ট গ্যালারীতে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পঞ্চাশবছর উপলক্ষে আয়োজিত প্রদর্শনী দেখতে কানাডায় বসবাসরত সকল বাংলাদেশিদের প্রতি আহবান জানান।

Comments