শুক্রবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৭:১০ pm

শব্দের ব্যবহার নিয়ে যত আপত্তি

শব্দের ব্যবহার নিয়ে যত আপত্তি

বাংলাদেশের কিছু শব্দের ব্যবহার নিয়ে আমার বেজায় আপত্তি। যেমন, তুষার শুভ্র। আরে বাবা, আমাদের দেশের নিজস্ব সাদা জিনিস নাই? নারকেল কুরা খাইছেন না? এর চাইতে সাদা জিনিস দুনিয়ায় আর আছে? এক বাটি মুড়ির উপর হাফ ইঞ্চি সাদা লেয়ারের নারকেল কুরা ছিটিয়ে দিলে কী অবস্থাটা দাঁড়ায়? তুষার মশাই এই সাদা দেখলে গলে পানি হয়ে  লুকানোর জায়গা পাবে না। তার উপরে চিনি ছিটালেই হয়ে গেলো দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ স্ন্যাক। ভাইবোনদের প্রতি আমার বিশেষ অনুরোধ, এখন থেকে 'তুষার শুভ্র' না বলে 'নারকেল শুভ্র' বলবেন।

এটা একটা অদ্ভুত নাস্তা। এ জগতে যদি ইউনিক কোনো জিনিস থাকে, তবে সেটা নারকেল মুড়ির কম্বিনেশন। চিবানোর সময় নারকেল-চিনির মিশ্রণ থেকে যে রস স্প্রে করে জিব্বা ভিজিয়ে দেয়; সেটার স্বাদ আসলে এই জগতের না। জিব্বাটাকে লেপ্টে থাকে কেকের উপর ক্রিম মাখানোর মত। এজন্যই মানুষ ভুলে মাঝে মাঝে জিব্বাটাকেই কেক মনে করে কামড়ে দিয়ে রক্তারক্তি করে। সৃষ্টিকর্তা ইহজগতে কিছু বেহেস্তের নিদর্শন দিয়ে রেখেছেন। যাই হোক, আমি আবার কম কথা বলার লোক।

এদেশেও নারকেল পাওয়া যায়। তবে সব থাইল্যান্ডের হাইব্রিড। মনে হয় কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ফুল থেকে নারকেল হয়ে যায়; ব্রয়লার মুরগির মতো। স্বাদ এতই বিদঘুটে আর বিস্বাদের...। বাংলাদেশের মানুষ যে কী নারকেল খায়, আর কত সৌভাগ্যবান; থাইল্যান্ডেরটা না খেলে বুঝবে না। সুবহানআল্লাহ। আর দেখেন, আমাদের দেশে নারকেল হতেই লাগে বছরখানেক। দেশি মোরগের মতো। শর্টকাট কোনো কিছুই ভালো না। বিয়ে ছাড়া।

মুড়ি প্রসঙ্গ যখন আসলোই, অনুমুতি নিয়ে দু-চারটা কথা না বলে কেমনে ঘুমাতে যাই? মুড়ি-চানাচুর বানায় আমার ছোট খালু। সেইরকম হ্যান্ডসাম মানুষ উনি; যেরকম তাঁর চেহারা, সেরকম গায়ের রং; পাকা মোহনভোগ আমের মতো। উনাকে বাংলার মসনদে বসালে সবাই বিনা বাক্যে জাহাঁপনা জাহাঁপনা করতে থাকবে। আর মাথায় কোহিনূরের মুকুট পড়ালে প্রিন্স চার্লস লজ্জায় বনবাসে চলে যাবে। যেরকম গলার ভয়েজ, সেইরম তাঁর মুড়ি মাখানোর হাত।

উনার মুড়ি মাখানো প্রক্রিয়া দেখার মত।

মনে করেন, ঈদের ছুটিতে বাড়ি এসেছেন। বড়-সরো এক গামলা মুড়ি মাখাবেন। কমসে কম পনেরো জনের। একজনকে পাঠাবেন এইমাত্র গরম তেল নিংড়িয়ে উঠানো আগুন গরম সিঙ্গারা আনতে। চানাচুর থেকে শুরু করে মরিচ; সব কিছু ডবল ডবল দিবেন। শুধু পিঁয়াজ আর কাঁচা মরিচই ঢালবেন যথাক্রমে এক পোয়া আর আধ সের। তবে মরিচ ঢালার আগে একটা মুখের মধ্যে খালি খালি আস্ত চিবিয়ে মিনিটখানেক অপেক্ষা করে ভাব বুঝবেন। আর পিঁয়াজ হতে হবে দেশি ছোট্ট কচকচে, ঝাঁঝালো। বাদাম দিবেন এক্সট্রা। চানাচুরের বাদামে তাঁর পোষায় না। যেন এক নলায় কমপক্ষে পাঁচটা বাদাম মুখে উঠে। সরিষার তেল ঘানি ভাঙ্গানো ছাড়া এলাউ-ই করবেন না! সেটারও কোয়ালিটি কন্ট্রোল আছে। নাকে মেখে কিছুক্ষন হাঁটাহাঁটি করে দেখবেন..।

মাখানোটাও চিত্তাকর্ষক। ঠিক সিমেন্ট যেভাবে মাখায়! একটা করে বাদাম, চানাচুরের বস্তা খুলবেন, আর তলা ধরে উল্টিয়ে ঢালবেন। তারপর সার্কুলার মোশনে পাশ থেকে মুড়ি তুলে তুলে মধ্যেখানটায় ফেলে মাখাতে থাকবেন... জোগাইলরা যেভাবে ইট-সুড়কি মেশায়! ও হ্যা, আরেকটা কথা বলতে ভুলে গেছি; লেবুর খোসা কুচি। মিহি করে কাগজী লেবুর খোসা  দেবেন।

খালুকে সিঙ্গারা ছাড়া কোনোদিন মুড়ি মাখাতে দেখি নাই। সব 'পজ' করে পাশের হোটেল থেকে সিঙ্গারা আনতে পাঠাবেন। সেই গরম সিঙ্গারা কমপক্ষে দশটা ভেঙে মুড়ির সাথে মিশাবেন। পাতলা চামড়ার নরম সিঙ্গারা হলে আবার ফেরত পাঠাবেন। চামড়া হতে হবে মচমচে, খড়খড়ে। আমের আচারের বয়াম থেকে পোয়া খানেক তেল ঢালবেন মশলাসহ। তারপর মাখানো হয়ে গেলে নিজে দুই নলা মুড়ি খেয়ে দেখবেন। দুই চোয়াল ঠিক স্টিম ইঞ্জিনের চাকার ওই লোহার দন্ডটার মতো আগ-পিছ করবে সেকেন্ডে দশবার। তারপর আদেশ দেবেন, আরেকটু সরিষা, পিঁয়াজ দে; লবনও লাগবে। নিশ্চিত হবার পরে ছাড়পত্র দেবেন। কোয়ালিটি কন্ট্রোল, ম্যানেজমেন্ট... ওফফ... ফাইভ ষ্টার!

ভাই রে ভাই, ওই মাখানো গামলা যখন সবার সামনে মেলে ধরা হয়.. মনে হয় যেন এইমাত্র হিরে-জহরতে ভরা সিন্দুকের ডালা খোলা হলো। চোখ ধাঁধিয়ে দেয় সর্ষে তেলে ঝলকানি। চকচকে লালচে বাদামগুলো যেন পান্না। আর পিঁয়াজগুলো যেন সব পাথরের খাঁজে খাঁজে আটকানো দক্ষিণ আফ্রিকার ডায়মন্ড! ধনেপাতা আর শসার কুঁচি দেখলে মনে হবে রংবেরঙের চুনি, মানিক, মুক্তা।

এই শেষ না, মুড়ি মাখানোর সময় কনডেন্সড মিল্কের চা রেডি রাখা চাই। মরিচের ঝালে সবাই ঠোঁট কাতল মাছের মতো চুমা খাওয়ার মতো করে ফেলবে। শব্দ করে বাতাস চুষুন দিয়ে ঝড়ের মত আওয়াজ তুলবে। নাক ঝাড়তে ঝাড়তে অবস্থা কাহিল। ওদিকে খালুজান মুঠি মুঠি মুখে পুড়বেন আর কিছুক্ষন পরপর বলতে থাকবেন- জব্বর! জব্বর! চায়ের কাপে এক্সট্রা কনডেন্সড মিল্ক আর চিনি দেওয়া থাকবে। ঝাল লাগলেই মিষ্টি চায়ের কাপে চুমুক...

তবে আবার মতে মুড়ি মাখানোর সময় যত নোংরা পরিবেশে বানাবেন, তত স্বাদ। বাদাম আর সরিষার তেল দিবেন দুই নাম্বার, ঐটার স্বাদ হবে দেখার মতো। মুড়িওয়ালাদের দেখছেন না? অধোয়া মরিচ নোংরা বোর্ডে কাটবে। তারপর শরীরের এখানে ওখানে চুলকাবে ওই হাত দিয়েই। পেঁয়াজের ধকের ঠেলায় কিছুক্ষন পরপর লুঙ্গিতে নাক ঝাড়বে। কাগজের ঠোঙা লক্ষ্য করলে দেখবেন তিন যুগ আগেকার টেস্ট পেপারস।

যাই হোক, মুড়ি খুব স্বাদের আর সম্মানিত জিনিস। কেউ দয়া করে 'মুড়ি খা', 'ভ্যান চালা গা' -এইসব আজেবাজে কথা আর দয়া করে বলবেন না; না বুঝেই। কথা একটা পাইলে হলো...

আর বিছানায় উঠার আগে পা ঝেড়ে উঠবেন, দেখবেন অনেক বালা-মুসিবত দূর। এই একটা জিনিস না করার কারণে বাঙ্গালীদের যত সমস্যা...

সবাই ভালো থাকবেন।

 

ডিসেম্বর ০২, ২০২০।

টরন্টো, কানাডা।

Comments