রবিবার, ১ আগস্ট ২০২১, ১০:০৪ am

নতুন দিনের প্রত্যাশা

নতুন দিনের প্রত্যাশা

২০২১ সালের কোন একদিন ঘোষণা হবে..পৃথিবীর কোন দেশেই আজ কোন নতুন কোরোনা ভাইরাস সংক্রমন নেই! না..ধুম করে হবে না। এই যেযেভাবে দিনে দিনে বেড়েছে..সেই ভাবেই দিনে দিনে কমতে কমতে জিরো হবে। হবেই।

টাইম ম্যাগাজিন তার লেটেষ্ট সংখ্যায় ২০২০ সালকে সবচেয়ে খারাপ বছর হিসাবে ঘোষণা করেছে। ম্যাগাজিনের কভারে ২০২০ লিখে লাল কালিতে ক্রস এঁকে দিয়েছে। ভেতরে লিখেছে, ২০২০ যদি একটা মুভি হয়ে থাকে তবে এই মুভি আপনি সম্ভবত ২০ মিনিট দেখার পরেই বন্ধ করে দেবেন।

কানাডায় গ্রেড নাইনে হাই স্কুল শুরু হয়। চলে গ্রেড ১২ পর্যন্ত। তরংগ সবে হাই স্কুলে যাওয়া শুরু করেছিলো। নতুন স্কুলনতুন বন্ধুসবচেয়ে বড় কথাএই প্রথম সে বুঝে শুনেনিজে নিজে সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করেছিলো।

তারপর..সারা পৃথিবীর মতো তার নতুন পৃথিবীটাও বন্দী হয়ে গেলো। থেমে রইলো। থেমে আছে আজ প্রায় এক বছর! কৈশোরের এই অসম্ভব মূল্যবান এক বছর তার পরের জীবনের বুড়িয়ে যাওয়া হাজার বছর দিয়েও খুঁজে পাবে না জানি। শুধু চাই আল্লাহ আমাদের সবাইকে বাঁচিয়ে রাখুক। ভালো আমরা আবার থাকবো।

ভ্যাক্সিনের খবর শুনে তরংগ কয়েক দিন থেকেই ভীষণ উত্তেজিত। একাধিক ভ্যাক্সিন বেরিয়ে গেছে!! সেগুলো আবার ৯০% এর উপরে কার্যকরী। মানুষের তৈরি সকল টিকার মধ্যে একমাত্র মিজেল্‌সই সম্ভবত এরচেয়ে বেশি যা প্রায় ৯৮% কার্যকরী।

তরংগ একটু পর পর আমার আর তার মায়ের আশে পাশে ঘোরাঘুরি করছে। একেক বার একেকটা প্ল্যান নিয়ে আসছে। সব ঠিক হলেপ্রথম সে কি করবেকোন মুভি দেখবে..কোথায় বেড়াতে যাবে……কোন বন্ধুর সংগে দেখা করবেকি কি মজা করবে।

আমি কৌতুহল নিয়ে শুনি। ওর র্নিভার আশাবাদ আমার বয়সী সন্দিহান মনকেও ভারমুক্ত করে।

আমি একটু খোঁচা দিয়ে বলি, সব ঠিক আছেকিন্তু একটা বিষয় নিয়ে কিন্তু তুমি কিচ্ছু বলছো না যেদিন কোরোনা পুরাপুরি চলে যাবে..সেই দিন..সে ক্ষনে তোমার সেলিব্রেশন কি হবে? সেদিনটা কিন্তু পৃথিবীর ইতিহাসের খুব গুরুত্বপূর্ণ তারিখ হবে। এমন শান্তির দিনমুক্তির দিন হয়তো আরো একশ বছর পৃথিবীতে আসবে না। তুমি হবে সেই বিরাট ইতিহাসের সাক্ষী। দিনটাকে স্মরনীয় করে রাখার উপায় কি? সেটা ভেবেছো কিছু?

তরংগ বিরাট চিন্তায় পড়ে গেল। আমার দিকে এমন অসহায় শিশুর মতো তাকালোআমি হেসে দিলাম। ছেলেটা শুধু শরীরে বড় হয়েছে। কিন্তু আসলে আগের মতোই আছে। একটু পাজ্ল হলেই...বাবা-মার দিকে তাকিয়ে থাকে। আমি কাছে টেনে বসালাম।

শোনোআজ তোমাকে Festa del Redentore এর গল্প বলি। তুমি ভেনিস শহর কোথায় জানো? ইটালীতে। অসম্ভব সুন্দর শহর। এই শহরে রাস্তার পরিবর্তে বাসা-বাড়ীর ভেতর দিয়ে খাল বা ক্যানাল আছে। মানুষ নৌকায় করে যাতায়াত করে। প্রচুর টুরিষ্ট আসে। সেই শহরে জুলাই মাসের তৃতীয় রবিবারে হয় উৎসব Festa del Redentoreইংরেজী মানে Feast of the Most Holy Redeemer রিডিমার মানে হচ্ছে উদ্ধারকারী। ত্রানকর্তা। কিন্তু এই রিডিমার যখন ক্যাপিটাল R দিয়ে লেখা হয় তখন খ্রীষ্টান ধর্মলম্বীদের কাছে একজন উদ্ধারকারীকেই বুঝায়। তিনি যীশু খ্রীস্ট। জিসাস। তার সম্মানেই এই জমকালো উৎসব। রবিবারে চার্চে চার্চে প্রার্থণা হয়। কিন্তু মুল আকর্ষন শুরু হয় আগের দিন শনিবার থেকেই।

মানুষজন তাদের নৌকা..বোটগুলো সুন্দর করে সাজায়। কিংবা বাসার ছাদে সবাই মিলে বসার জন্য সুন্দর ছাউনী তৈরী করে। তারপরশনিবার সূর্য ডুবে যাওয়ার পরপরশহরের দুটো বড় খাল যেখানে মিশেছে সেই সেইণ্ট মার্কস বেসিনের উপরের আকাশ জুড়ে শুরু হয় রংয়ের খেলা!! আলো ঝলমল আতশবাজীতে মনে হয় ভেনিস যেন সারা পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর রঙ্গমঞ্চ! মানুষ বেলুন আর ফুল দিয়ে সাঁজানো নৌকায় বসেবা বাড়ীর সাঁজানো ছাদের ছাউনীতে বসে রাতের ডিনার করতে করতে সেই আলোর ঝর্নাধারা উপভোগ করে।

এই উৎসব কেন হয় জানো? পনেরশো সালের দিকে ভেনিসসহ সারা বিশ্বে কোভিডের মতো আরেকটি ভয়াবহ রোগ ছড়িয়ে গিয়েছিলো। তার নাম প্লেগ। এতো মানুষ মারা গিয়েছিলো যে এই রোগের নামই হয়ে গেছিলো ব্ল্যাক ডেথ! সেই রোগ যখন বিদায় নিলো ভেনিস থেকে তখন খুশীতে শহরের মানুষ পালন করেছিলো Festa del Redentore সেই থেকে শুরু এই উৎসব সাড়ে চারশো বছর ধরে পালন করছে ভেনিসবাসী।

তরংগের চোখে খুশি দেখে আমার ভালো লাগলো।

সে আনন্দিত গলায় বললো..এবারও কি তেমন কিছু হবে.? কানাডায়?

আমি বললাম, অবশ্যই হবে বাবা। দেশে দেশে হবে। মানুষ প্রতি দিন মৃত্যু হাতে নিয়ে চলে। রোগ-শোক-মহামারী-যুদ্ধ সেই মত্যুকে আরো ভয়াবহআরো বিরাট করে তোলে। কিন্তু ইতিহাস বলে মানুষ বারবার তা পেড়িয়ে এসেছে। এবারও আসবে ইনশাল্লাহ। অন্ধকার আকাশে আলোর মশাল জ্বালিয়ে সাহসী মানুষ সেই বিজয়কে একদিন সম্মানও জানাবে।

 

টরন্টো, কানাডা।

Comments