শুক্রবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৭:৩৪ pm

প্রেম বলে কিছু নেই

প্রেম বলে কিছু নেই

 

জাভেদ ইকবাল

 

প্রেম আর ভালোবাসা; খুব খারাপ জিনিস।

 

এদের মধ্যে পার্থক্য খুঁজতে যাওয়া মানে দিনটাই মাটি। তাও যদি কোনো সিদ্ধান্তে আসা যেত। একদিকে কিশোর কুমার বলে 'প্রেম বড়ো মধুর', ওদিকে সুবীর নন্দী বলে, 'প্রেম বলে কিছু নেই'কোন দিকে যাই? কাউকে জিজ্ঞেস করতেও প্রেস্টিজে লাগে। করলেই চোখ কপালে তুলে বলবে, জাভেদ ভাই এইটা জানেন না? ছিঃ ছিঃ...আপনি কোথা থেকে পাশ করছেন বলেন তো?

 

আর পোলাপান ভালোবাসতে বাসতে এমনই বাসে গো! মুখে 'আমার আমার' ছাড়া কোনো কথা নাই। আরে, ওই মেয়ের/ছেলের বাপ কি শশুর? মিলেমিশে বাস করা যায় না? বলা যায় না 'সবাই সবার'? বাচ্চারা যেমন জন্মদিনের কেক কাটা হয়ে গেলে বেলুন নিয়ে কাড়াকাড়ি করে 'আমার আমার' বলে চেঁচায়; ঠিক সেরকম। তারপর বেলুন ধস্তাধস্তির সময় বিকট শব্দে ফুটলে সব দৌঁড়ে কোথায় পালায়...। যেন কান্দাহারের কোনো ইন্সিডেন্ট।

 

একটা গান আছে কিশোর কুমার আর আশা ভোঁসলে'র- "তুমি আমার আমি তোমার".. এইভাবে বলতে হয়। দুইজনই দুইজনার। সেই নব্বই সালের গোড়ার দিকে বিয়েগুলোতে এই একটা গানই চলতো মাইকে পুরা ফিতা জুড়ে। সবচাইতে বেশি 'আমার আমার' চলে রাজশাহী ইউনিভার্সিটির বাসে সিট্ দখলের সময়। এক ঘন্টা আগে থেকে যে যা পায় তাই নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। নোট/সাজেশন, ব্যাগ, কলম, গাছের পাতা, ইটের দলা, খোয়া, দুই টাকার নোট পয়সা। ব্যাস, সিট্ তার! গাড়ি ছাড়ার পর জায়গা ফাঁকা পেয়ে বসে ভাববেন মালিক আর আসবে না। ওদিকে মালিক ভিড় ঠেলে ঠিক এসে হাজির হয়ে বলবে, ভাই সিটটা 'আমার'...

 

 

 

বাংলাদেশের জন্মদিন আসলেই মজার। কেক-এর সাথে সিঙ্গারা, চানাচুর। ভাগ্য ভালো হলে মিষ্টি বোনাস। কেক-এর চারপাশ থাকে রং-বেরঙের নারকেলের মিহি কুচি। ক্রিম খুব তেলতেলে হলেও ইউনিক একটা ফ্লেভার। কেকের বেশি ক্রিমের অংশটা পাবার ইচ্ছে থাকলেও ভাগ্যে জুটতো পাতলা স্লাইস, সাথে শক্ত ফুলমফস্বল শহরের ফুল খাওয়া যায় না। তিতা লাগে।

 

পাঠকদেরকে একটা ফ্রি পরামর্শ দিচ্ছি। জন্মদিনে হুটাপাটা করে কেক না নিয়ে নিবেন সবার শেষে। বড়টা জুটবে। আর হোস্টও খুঁজে এমনই হাড় কিপ্টে ভাবি দিয়ে কেক কাটায় রে বাবা.. স্লাইস করবে পাউরুটির চাইতেও পাতলা। তিন পাউন্ডের কেক কেটে হাজারটা মানুষকে খাওয়ানোর পায়তারা করবে। আসলে হুটাপাটা জিনিসটাই খারাপ।

 

দেশের খাবার-দাবারের প্রতি ভালোবাসার একশো একটা কারণ আছে। দেশের সবজির সাথে পশ্চিমা দেশের সবজির আকাশ পাতাল ফারাক। যেমন, বেগুন ভর্তার স্বাদ দুনিয়ার অন্য কোথাও পাবেন না। ভর্তায় ঝাঁঝালো কাঁচা মরিচ, পিঁয়াজগুলো যেন এক একটা হীরে-পান্না। ভর্তা মুখে দেওয়া মানে সুন্দরবনের গহীন অরণ্য থেকে বাওয়ালীদের পেরে আনা উষ্ণ মধুতে টইটম্বুর মৌচাক নিংড়িয়ে অমৃত সুধা মুখে পুরে রবীন্দ্রসংগীত শুনতে বসা। আর বেগুন চাকা চাকা করে ভাজলে খোসা যে মচমচে হয়! ঘি ঘি গন্ধও চলে আসে। ঐটা দিয়ে আরামসে ক্যারাম বোর্ড খেলা যাবে। কিছু মানুষ আবার চাকা বেগুনের খোসা খায় না। যার যা রুচি...

 

তবে ইলিশের প্রতি যে টান; সেটা ভালোবাসা হওয়ার কথা না। ওটাকেই হয়তো বলে আসল প্রেম। শুনলাম এবারও দেশে ইলিশের বাম্পার ফলন হইছে। করোনা না থাকলে নিশ্চিত এবার যেতাম। দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ খাবার হলো ধোয়া উঠা সাদা ভাতের মধ্যে লবন ছিটিয়ে একটা ডিমশুদ্ধ গাট্টাগোট্টা ইলিশ মাছের পেটি ভাজা। ভাজার কড়াই থেকে দুই চামচ গরম তেল ভাতের সাথে মাখিয়ে নিতে হয়। ইলিশ জিনিসটাকে আল্লাহ তায়ালা দুইহাত উজাড় করে বানাইছে। পিত্ত আর আঁশ ছাড়া সব কিছু খাওয়া যায়। ডিমের পাশে কালচে চর্বিযুক্ত নাড়িটা একটা জিনিস! কোনোদিন যদি বেহেস্তে যাওয়ার সুযোগ পাই, সেখানকার শেফ'কে ভাতের সাথে হাফ প্লেট নাড়ি দিতে বলব। আর চাইবো মায়ের হাতের ডাল।

 

সত্যি, ডাল বানাতো আমার আম্মা; কয়েক ক্যাটাগরির। একটা স্পেশাল ডালের রেসিপি খুঁজছিলাম। ওই ডালের ন্যাচারাল রং, আর ছোট দেশি মসুরের বাঁকানো ছোট্ট মাইক্রোস্কোপিক বোঁটাগুলো যেন তসর সিল্ক শাড়ির ওপরে ময়ূরীর ঝিলিকমারা ডিজাইন।

 

আজকে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম, ফোন করেই আগে আম্মাকে সরাসরি সেই ডালের কথা জিজ্ঞেস করবো। খাইছো না কি, শরীর কেমন আছে; এইসব কথা পরে হবে। কয় বছর ধরে যে ভাবতেছি জিজ্ঞেস করবো..

 

আম্মা ফোন ধরতেই বললাম, তুমি আগে ঘন মসুরের ডাল বানাইতা কিভাবে? মশলা-টশলা ছাড়া?

 

- ও কিছু না। আজকালকার ডালে কি আর ঐ স্বাদ পাবি?

 

- তাও বলো

 

- খুব সহজ। মসুরের ডাল সিদ্ধ করে নিবি। তারপর ঘুঁটা দিয়ে শুধু পেঁয়াজ আর শুকনা মরিচ ভেজে ছেড়ে দিবি। আর কিচ্ছু না

 

- বাগাড়?

 

- না

 

- লবন?

 

- ওমা! পাগল ছেলে বলে কী! লবন ছাড়া কিভাবে খাবি বোকা...

 

 

আমি রাতেই আরম্ভ করে দেই। কথামত ডাল ফুটিয়ে একটা হ্যান্ড ব্লেন্ডার দিয়ে দিলাম ঘুটা। ডাল ঘুটার জিনিস এখানে কোই পাবো?

 

Comments