Thu 22nd Oct 2020, 12:38 pm

মহীয়সী এলিন ক্রেঁতিয়ের প্রয়াণ

মহীয়সী এলিন ক্রেঁতিয়ের প্রয়াণ

মোহাম্মদ আলী বোখারী  

কানাডার সাবেক প্রধান মন্ত্রী জ্যঁ ক্রেঁতিয়ের পত্নী এলিন ক্রেঁতিয়ের প্রয়াণ ঘটেছে। গত শনিবার সকালে ৮৪ বছর বয়সে পারিবারিক পরিমন্ডলে ক্যুইবেকের শনিগানের ‘লাক দেস পাইল’ আবাসে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বলা হয়, তিনি ছিলেন ক্রেঁতিয়ের সবচেয়ে বিশ্বস্ত পরামর্শক ও সব প্রেরণার উৎস; যেন ‘রক অব জিব্রালটার’, ইউরোপের ইবিরিয়েন উপসাগরে ১,৩৯৮ ফুট সুউচ্চ মনোলিথিক পাথরের সমতুল্য। তেমনটাই জাতীয় সম্প্রচার মাধ্যম সিবিসি অভিহিত করেছে। 

এলিন ক্রেঁতিয়ের আকস্মিক মৃত্যুতে কানাডার জাতীয় অঙ্গণে শোকের ছাঁয়া নেমে আসে। এতে গভর্নর জেনারেল জুলি পায়েট, প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো, সাবেক প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন হার্পার, কনজারভেটিভ পার্টির সদ্য নির্বাচিত দলীয় প্রধান এরিন ও’তুলসহ অপরাপরদের সঙ্গে অন্টারিও প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ড টুইট বার্তায় নিজস্ব অভিব্যক্তি তুলে ধরেন। 

জুলি পায়েট লিখেন, ‘মাদাম এলিন ক্রেঁতিয়ে ১৯৯৯ সালে ক্যাপ ক্যানাভারাল থেকে আমার প্রথম মহাকাশ উড্ডয়নে উপস্থিত ছিলেন। বিশাল হৃদয়ের এ নারী ছিলেন আগ্রহদ্দীপক ও উদার। তার পরিবারের প্রতি রইল আমার গভীর সমবেদনা।’ প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো লিখেন, ‘স্বামী জ্যঁ-র পাশে অবিসম্ভাবী প্রেরণা, সুদৃঢ়চিত্তের মতো মাতা ও অনুরাগী সঙ্গী হিসেবে এলিন ক্রেঁতিয়ে বিশ্বস্ততায় ক্যুইবেক ও কানাডার জনগণের সেবা করে গেছেন। তিনি ছিলেন বহুজাতিকতা ও দ্বৈত ভাষার প্রতি নির্ভেজাল ও ধৈর্যশীল অগ্রদূত এবং আমাদের জনগোষ্ঠিকে একীভূত করেছেন।’ স্টিফেন হার্পার লিখেন, ‘এলিন ক্রেঁতিয়ের মৃত্যুতে লরিন ও আমি গভীর শোকাভিভূত। কখনোই ভুলবো না স্বামী জ্যঁ ও পরিবারের প্রতি তার সদয় প্রকৃতির কথা। আমরা কানাডার জনগণের সঙ্গে দেশের প্রতি তার আমরণ সেবার জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি।’ এরিন ও’তুল লিখেন, ‘এলিন ক্রেঁতিয়ের মৃত্যুতে রেবেকো ও আমি গভীর শোকাভিভূত। সাবেক প্রধানমন্ত্রী জ্যঁ ক্রেঁতিয়ে, দম্পতির সন্তান ফ্রান্স, হুবার্ড ও মিশেলের প্রতি এই দুঃসময়ে আমাদের সমবেদনা জানাচ্ছি।’ আর ডগ ফোর্ড লিখেন, ‘সাবেক পিএম জ্যঁ ক্রেঁতিয়ে এবং একই সঙ্গে এলিন ক্রেঁতিয়ের পরিবারের প্রতি রইল তাদের স্বজন হারানোর সমবেদনা। কানাডার জনগণের স্বার্থে তার দৃঢ়কন্ঠ ও অগ্রদূত ভূমিকায় সন্মান প্রদর্শন করছি।’

ভাবুন, এই অভিব্যক্তিগুলো কীসের বর্হিপ্রকাশ? তাতে সুস্পষ্ট যে, কেবলমাত্র কানাডার একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মীনি হিসেবেই নয়, বরং তার নিজস্ব কিছু মহীয়সী গুণাবলী ছিল, যার জীবনাবসানে সমাদরটি পুর্ণব্যক্ত হয়েছে।

বাস্তবিক অর্থে, ১৯৫১ সালের গ্রীস্মে তাদের পরিচয় ঘটে এক যাত্রীবাহী বাসে, যখন জ্যঁ ক্রেতিয়ের বয়স ১৭ এবং এলিনের ১৫। তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন ১৯৫৭ সালে, যে সময়টায় জ্যঁ ক্রেঁতিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার ফাঁকে একটি মিলে কাজ করতেন। শুরু থেকেই এলিন ক্রেঁতিয়ে বুঝে যান, জ্যঁ কানাডার প্রধানমন্ত্রী হবেন এবং সেজন্য একটি ঔজ্জ্বল দশক তার জন্য অপেক্ষমান। তবে এলিন ১৬ বছর বয়সেই পরিবারের সাহায্যার্থে সেক্রেটারিয়াল জব শুরু করায় স্কুল ‘ড্রপ আউট’ হন; তা সত্তে¡ও তার সুঊচ্চ স্বপ্ন  দেখা থামেনি। তিনি বিদেশে গিয়ে একাধিক ভাষা আয়ত্ব করেন। সেই আগ্রহপূর্ণ স্পৃহাই পরবর্তীতে তার স্বামীর রাজনৈতিক জীবনে সাফল্য বয়ে আনে, কিন্তু জনসমক্ষে তিনি ছিলেন নিভৃতচারীনি। ১৯৯৪ সালে ম্যাকলিন্স ম্যাগাজিনের সঙ্গে এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেন, ‘জ্যঁ-কে বিয়ে না করলে কেউ কখনো আমাকে দেখার সুযোগ পেতেন না। আমি জনগণকে ভালবাসি, তবে তা প্রকাশে অনীহ ছিলাম।’ সেজন্য এলিন বিশেষ করে সন্তানদের তারুণ্যে পারিবারিক জীবনকে সব সময়ই লোকচক্ষুর অন্তরালে রাখেন। এতে দেখা যায়, জ্যঁ ক্রেঁতিয়ে তার আত্মজীবনীমূলক ‘স্ট্রেইট ফ্রম দ্য হার্ট’ গ্রন্থে কন্যা ফ্রান্সের কথা যৎসামান্য লিখলেও সন্তান হুবার্ট ও দত্তকপুত্র মিশেলের কথা মোটেও লিখেননি। আর যখন স্বামী প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন, সে সময় তার পাশে থেকে কেবলই অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ব্রায়েন মালরুনির ভাষায় দেশের জন্য তিনি ছিলেন, ‘ফরমিডাবল্ কন্ট্রিবিউটর’ বা অশেষ অনুপ্রেরণার উৎস। আরও বলেন, ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও তার পরিবারের জন্য তিনি ছিলেন প্রজ্ঞাশীল; অনেকের ক্ষেত্রেই তিনি হয়ে ওঠেন একজন দক্ষ ও বাগ্মী পরামর্শক’। 

১৯৯৫ সালে আন্দ্রে ডালায়ার নামের যে মানসিক রোগীটি ১৯৯২ সালে সংবিধানে সংযোজিত চার্লটটাউন গণভোটে অসন্তুষ্ট হয়ে প্রধানমন্ত্রীর ২৪ সাসেক্স স্ট্রিটের নিবাসে প্রবেশে যখন সমর্থ হয়, তখন এলিন ক্রেঁতিয়ের মুখোমুখি হয়। এতে এলিন নিজের শয়নকক্ষে গিয়ে দরজা আটকিয়ে জ্যঁকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলেন এবং জরুরি কল করে ইনুয়িট কার্ভিং চাকু হাতে উভয়ের সুরক্ষায় আরসিএমপি না আসা পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকেন। পরে আরসিএমপি আন্দ্রেকে গ্রেফতারে সক্ষম হয়, কিন্তু সে প্রধানমন্ত্রীর শয়নকক্ষে প্রবেশে ব্যর্থ হয়। হত্যা অপচেষ্টায় সে কোর্টে দোষী প্রমাণিত হলেও মানসিক বৈকল্যের কারণে ফৌজদারী মামলায় সাজা পায়নি। কৃতজ্ঞ জ্যঁ ক্রেঁতিয়ের ভাষায় ‘আন্দ্রে জ্যাকনাইফ হাতে আমাদের শয়ণকক্ষের বাইরে অপেক্ষায় ছিল, ওপাশে আমার স্ত্রী নির্ভয়চিত্তে দাঁড়িয়ে ছিল’।

এলিন তার জীবনের অনেকটা সময়ই পরিবার ও বন্ধুদের জন্য পিয়ানো বাজানোয় নিবেদিতপ্রান ছিলেন। সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী শিলা কপের ভাষায়, ‘তিনি কেবলমাত্র প্রধানমন্ত্রীর জন্য প্রত্যয়াতীত ছিলেন না, বরং নারী জাগৃতির বন্ধুও ছিলেন’। সিবিসি-কে দেয়া এক সাক্ষাতকারে শিলা বলেছেন, তার কারণেই কানাডায় তিনি প্রথম কোনো নারী উপ-প্রধানমন্ত্রী হন। এছাড়াও সাবেক লিবারেল দলনেতা ও বর্তমানে জাতিসংঘে কানাডার রাষ্ট্রদূত বব রে বলেন, ‘জ্যঁ ক্রেঁতিয়ের জীবনে এলিন ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ নোঙ্গর’। 

কারো প্রতি ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষেত্রেও এলিনের প্রভাবে জ্যঁ ক্রেঁতিয়ে হয়ে ওঠেন মহানুভব। ২০০৩ সালে সিবিসি-র সাবেক প্রতীথযশা উপস্থাপক পিটার ম্যান্সব্রিজকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে এলিন বলেন, ‘জীবন সংক্ষিপ্ত, তাই রাজনীতিতে ক্ষমা প্রদর্শন অপরিহার্য; যারা ক্ষমা দেখান না, সেটা ভালো নয়। সেক্ষেত্রে জ্যঁ ছিলেন উদার, যা আমি পছন্দ করতাম; কেননা আনন্দচিত্তে জীবনে এগিয়ে যাওয়াটাই গুরুত্ববহ’। কেননা আমার প্রত্যাশার বাতায়নে ছিল- ‘লোকে বলুক জনগণের কল্যানার্থে তিনি কঠোর পরিশ্রমী, তিনি একজন ভালো প্রধানমন্ত্রী’। 

এই দম্পতির রাজনৈতিক সাফল্য তাদের উভয়ের কারণেই হয়ে ওঠে ঈর্ষনীয়। মৃত্যুর মাত্র দুদিন আগে অর্থাৎ ১০ সেপ্টেম্বর এলিন তাদের ৬৩তম বিবাহ বার্ষিকী উদযাপন করে গেছেন।    

Comments