Sat 4th Apr 2020, 5:34 am

আমার জীবনের ভুলগুলো ওদের ভেতর দেখতে চাইব না

আমার জীবনের ভুলগুলো ওদের ভেতর দেখতে চাইব না

বাংলামেইল ডটকম ডেস্ক

বিশে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শুরু, একুশে দেশের ইতিহাসের প্রথম ওয়ানডে সেঞ্চুরি, বিশ্বকাপে দেশের প্রথম ফিফটি, এরপর পঁচিশেই শেষ৷ ক্যারিয়ার দীর্ঘায়িত না করতে পারার আক্ষেপে এখনও পোড়েন তিনি৷

মেহরাব হোসেন অপি বাংলাদেশ ক্রিকেটের এক চিরবিস্ময়৷ প্রতিভার কারণে; প্রতিভার অপচয়ের কারণেও৷ তাতে নিজের দায় ঠিকই দেখেন৷ এবারের অনূর্ধ্ব-১৯ দল বিশ্বকাপ জেতার পর উত্তরসূরীদের প্রতি তাই মেহরাবের খ্যাতির বিড়ম্বনা নিয়ে সতর্কবার্তা৷ সাক্ষাৎকার নিয়েছেন নোমান মোহাম্মদ৷

ডয়চে ভেলে : কম বয়সে সাফল্য আপনিও পেয়েছেন৷ মাত্র ২০ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক; ২১ বছর বয়সে বাংলাদেশের প্রথম ওয়ানডে সেঞ্চুরিয়ান৷ আর এবারের অনূর্ধ্ব-১৯ দল তো বিশ্বকাপই জিতল৷ এত কম বয়সের সাফল্যে কেমন লাগে, নিজের অভিজ্ঞতা থেকে যদি বলেন?

মেহরার হোসেন অপি : আমি যখন খুব অল্প বয়সে সেঞ্চুরিটি পেলাম, তখন ভালো তো লেগেছে অবশ্যই৷ এর ভালো দিক রয়েছে, পাশাপাশি খ্যাতির বিড়ম্বনাও৷ আমরা তো এমনিতেই আবেগপ্রবণ জাতি৷ অল্প বয়সের সাফল্য অনেকের জন্যই খ্যাতির বিড়ম্বনা হয়ে দাঁড়ায়৷ তখন অনেকে খেলাধূলার বাইরে গিয়ে খ্যাতি নিয়ে বেশি চিন্তিত হয়ে পড়েন...

আপনার নিজেরও কি অমন হয়েছিল? ক্রিকেটের চেয়ে খ্যাতির দিকেই ছুটছিলেন বেশি?

আমার ক্ষেত্রে ঠিক সেটিই হয়েছিল৷ এবারের অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের দলের সবারই বয়স কম৷ ওরা সাফল্য এনেছে৷ বিশ্বকাপ জেতা এক বিরাট ব্যাপার৷ এখন এই ছেলেদের মনোযোগ ক্রিকেট থেকে সরে যেন খ্যাতির দিকে ঝুঁকে না যায়, সে জায়গায় আমাদের সবারই বড় দায়িত্ব৷ সেজন্য ওদের বছরজুড়ে ক্রিকেটে আরো ব্যস্ত রাখা যেতে পারে৷

প্রশ্ন : অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ প্রথম অংশ নেয় ১৯৯৮ সালে৷ আপনি সে দলের অংশ৷ সেবার প্লেট চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশ৷ সে টুর্নামেন্টের কোন স্মৃতি মনে আছে?

মেহরাব : ২২ বছর আগের সব স্মৃতিই মনে আছে৷ তখন প্লেট চ্যাম্পিয়ন হওয়াই আমাদের কাছে বিরাট পাওয়া৷ ইংল্যান্ডের মতো দলকে হারাই৷ ওয়েস্ট ইন্ডিজের মতো দলকে হারাই প্লেট ফাইনালে৷ সে দলে ক্রিস গেইল ছিলেন; ফাইনালে তাঁর ১৫০ রানের উপরে একটি ইনিংস ছিল (আসলে ১৪১*)৷ ওই অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের স্মৃতি এখনও আমার মাঝে শিহরণ জাগায়৷ এবার ২২ বছর পর বাংলাদেশ একই টুর্নামেন্টে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হল৷ এটি অবশ্যই বিরাট বড় অর্জন৷ 

প্রশ্ন : এবার আপনার সেই সেঞ্চুরির কথা যদি বলেন৷ ১৯৯৯ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সেঞ্চুরিটি ওয়ানডেতে বাংলাদেশের কোনো ব্যাটসম্যানেরই প্রথম৷ এর আগে আপনার চাচা আজহার হোসেন শান্টু করেন দেশের প্রথম হাফ সেঞ্চুরি; ১৯৯০ সালে অস্ট্রাল-এশিয়া কাপে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে৷ দুজনের এমন কীর্তি নিশ্চয়ই আপনার পরিবারের বড় গৌরব?

মেহরাব : অবশ্যই৷ আমার অনুপ্রেরণা চাচার ফিফটি থেকেই পাওয়া৷ তখন ডিশ এন্টিনার যুগ ছিল না৷ টেলিভিশন এন্টেনায় হাড়ি-পাতিল লাগিয়ে দূরদর্শনে খেলা দেখতাম৷ এখনও চাচার হাফ সেঞ্চুরির সে দিনটি মনে আছে৷ বাবার কোলে বসে দূরদর্শনে খেলাটি দেখছিলাম৷ চাচা ফিফটি করে আউট হবার পর বাবা আমাকে খুব আহলাদ করে বলেন, ‘‘বাবা, তুমি বড় হয়ে দেশের প্রথম সেঞ্চুরি করে দেখাবে৷'' বাবাকে কথা দিয়েছিলাম৷ তবে সেটি ছিল ছোট্ট একটি ছেলের বাবাকে আহলাদ করে বলা৷ পরবর্তীতে তা যে বাস্তবে রূপ নেবে, কখনো ভাবিনি৷ তবে বাংলাদেশের প্রথম সেঞ্চুরিয়ান হবার স্বপ্ন দেখছিলাম তখন থেকেই৷

প্রশ্ন : যে প্রতিযোগিতায় সেঞ্চুরি করলেন, সেই মেরিল ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচে তো একাদশেই ছিলেন না৷ সে খেলায় আরেক ওপেনার শাহরিয়ার হোসেন বিদ্যুৎ সেঞ্চুরি প্রায় করেই ফেলেছিলেন৷ শেষে আউট হন ৯৫ রানে৷ তখন কি মনে এমন ভাবনা এসেছিল যে, বিদ্যুৎ সেঞ্চুরি করলে তো আমার বাংলাদেশের প্রথম ওয়ানডে সেঞ্চুরিয়ান হওয়া হবে না?

মেহরাব : এটি সত্যি যে, অনেক ঈর্ষাকাতর হয়ে পড়েছিলাম৷ ও যখন ৯০-এর ঘরে, তখন ড্রেসিংরুমের অনেকে বলছিলেন, বাংলাদেশের প্রথম সেঞ্চুরি হতে যাচ্ছে৷ সে সময়ে আমি মোটেও খুশি ছিলাম না৷ বাবার কথা মনে পড়ছিল৷ মনে পড়ছিল, চাচা প্রথম হাফ সেঞ্চুরিয়ান এবং আমি প্রথম সেঞ্চুরিয়ান হব বলে বাবাকে কথা দিয়েছিলাম৷ তাই চাইছিলাম না যে, বিদ্যুতের সেঞ্চুরি হোক৷ শেষে তো হলই না (হাসি)৷ পরের ম্যাচে একাদশে সুযোগ পেয়ে ৭৮ রান করে নবম ব্যাটসম্যান হিসেবে আউট হই...

৭৩ রান, জিম্বাবোয়ের বিপক্ষে৷

হ্যাঁ, ৭৩৷ এতে আমি খুব আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠি৷

কেনিয়ার বিপক্ষে পরের ম্যাচে ২৩ রানের পর জিম্বাবোয়ের বিপক্ষে সেই সেঞ্চুরি৷ যে সেঞ্চুরির উপহার হিসেবে বিশেষ এক উপহার পান সাবেক ক্রিকেটার ইউসুফ বাবুর কাছ থেকে৷ সে গল্প শুনেছি আগে৷ যদি আবার একটু বলেন...

ইউসুফ বাবু ভাইয়ের সে উপহার এখনো আমার শো কেসে সাজানো৷ উনি একটি ক্যাপ উপহার দেন৷ ১৯৯৯ বিশ্বকাপ খেলার জন্য যখন ইংল্যান্ডে যাই, তখন৷ উনি ক্যানাডায় থাকতেন৷ সেখান থেকে ক্যাপটি নিয়ে আসেন৷ এমনিতে ইউসুফ বাবু ভাই আমার আদর্শ ব্যাটসম্যান৷ ছোটবেলায় চাচার হাত ধরে যখন মাঠে যেতাম, তখন ইউসুফ বাবু ভাইয়ের ব্যাটিংই সবচেয়ে ভালো লাগত৷ ১৯৯৯ বিশ্বকাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৬৪ রান করার পর সে রাতে উনি আমাদের হোটেলে আসেন সহধর্মিনীকে নিয়ে৷ সবার সামনে ক্যাপটি বের করে উপহার দেন আমাকে৷ ক্যাপের উপর লেখা ছিল, ‘হিস্টোরিকাল ১০১, ২৫ মার্চ ১৯৯৯'৷ আমি জীবনে যত পুরষ্কার পেয়েছি, তার মধ্যে সেঞ্চুরির পুরস্কার হিসেবে পাওয়া এটি আমার অন্যতম প্রিয়৷ 

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে যে ম্যাচের কথা বললেন, সেদিন গড়লেন আরেক ইতিহাস৷ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের পক্ষে প্রথম ফিফটিও আসে আপনার ব্যাট থেকে৷ এটিও নিশ্চয়ই আরেক গর্বের জায়গা?

অবশ্যই৷ ওয়ানডেতে বাংলাদেশের প্রথম সেঞ্চুরিয়ান কিংবা বিশ্বকাপে প্রথম ফিফটি করা ব্যাটসম্যান হিসেবে আমার নামটি যখন উঠে আসে, তখন খুব গর্ব বোধ করি৷ 

প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিটি যে করতে পারেননি, এ নিয়ে আক্ষেপ?

মেহরাব : এ আক্ষেপ এখনো আছে৷ এটি আমার কাছে একটি অসম্পূর্ণ ব্যাপার যে, টেস্টে আমার একটি সেঞ্চুরি নেই৷

টেস্টে দেশের প্রথম সেঞ্চুরি কিংবা সব মিলিয়েই টেস্ট সেঞ্চুরি না থাকার কথা বলছেন?

হ্যাঁ৷ 

সামগ্রিক অর্থে ক্যারিয়ার নিয়েও আপনার অতৃপ্তি রয়েছে কিনা? দেশের সবচেয়ে প্রতিভাবান ব্যাটসম্যানদের একজন হিসেবে এখনো বিভিন্ন আড্ডায় আপনার নাম উচ্চারিত হয়৷ কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে নয় টেস্টে এক ফিফটিতে ২৪১ রান এবং ১৮ ওয়ানডেতে এক সেঞ্চুরি, দুই ফিফটিতে ৪৪৯ রান৷ পেছন ফিরে তাকালে কতোটা আফসোস হয়?

জাতীয় দল থেকে বাদ পড়ার পর প্রথম প্রথম আফসোস করতাম৷ এখন খুব একটা করি না৷ তখন বাংলাদেশ ক্রিকেট মাত্র হামাগুড়ি দিয়ে চলা শুরু করেছে৷ একটি ফিফটি করলেও বিরাট পাওয়া৷ সেদিক থেকে মনে হয়, আমি বাংলাদেশের হয়ে যতটুকুই খেলেছি, তাতে তৃপ্ত৷ তবে এক দিক দিয়ে আক্ষেপ আছে, ক্যারিয়ার হয়তো আরেকটু লম্বা হতে পারত৷

বাংলাদেশের জার্সিতে শেষ ম্যাচ খেলেন মাত্র ২৫ বছর বয়সে৷ এ নিয়ে নিশ্চয়ই কষ্ট আছে?

কষ্ট তো আছেই৷ ওই যে বললাম, ক্যারিয়ার আরেকটু লম্বা হতে পারত৷ দুর্ভাগ্যজনকভাবে তা হয়নি; সেটি নিজের জন্য হোক৷ আমার কাছে মনে হয়, নিজের উপর একটু বেশি অত্যাচার করেছিলাম বলেই হয়তো ক্যারিয়ারটা লম্বা করতে পারিনি৷ কিন্তু নিজে যা করতে পারিনি, এখন ক্রিকেট কোচিংয়ে এসে সেটিই ছেলেদের বোঝানোর চেষ্টা করছি৷ কিভাবে আরো পরিণত হওয়া যায়, তাও শেখাচ্ছি...

কিংবা নিজের উপর কিভাবে কম অত্যাচার করা যায়...

সেটাই৷ ওরা বিপথগামী যেন না হয়৷ সবাই ভুল থেকেই শিক্ষা নেয়৷ জীবনের ভুল থেকে আমি অনেক শিক্ষা নিয়েছি৷ যাদের ক্রিকেট খেলা শেখাচ্ছি, অবশ্যই চাইব না, ওদের ভেতর আমার জীবনের ভুলগুলো দেখতে৷ আমি চাই, ওরা যেন এসব থেকে দূরে থাকে৷ কিভাবে সুন্দর জীবনযাপন করা যায়, সুন্দর ক্রিকেট খেলা যায়, ওদেরকে সেসব শেখানোর দিকেই আমি মনোযোগ দিই৷

অনূর্ধ্ব-১৯ দিয়ে শুরু করেছিলাম, অনূর্ধ্ব-১৯ দিয়েই শেষ করি৷ এই ছেলেগুলো ১৭-১৮-১৯ বছর বয়সে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়ে গেছে৷ বিস্তর নাম-যশ-খ্যাতি পেয়েছে; পুরো দেশ ওদের মাথায় তুলে রেখেছে৷ আপনার মতোই অনেক কম বয়সে খ্যাতি পেয়ে যাওয়া এই উত্তরসূরীদের প্রতি আপনার বার্তা কী থাকবে?

এ বার্তাই থাকবে, ক্রিকেটে আরো বেশি মনোনিবেশ করা উচিত৷ অল্প বয়সে অনেক খ্যাতি এসে পড়েছে৷ তবে খ্যাতির তো শেষ নেই৷ এখনো অনেক কিছু বাকি৷ আমরা একজন সাকিব আল হাসানের দিকে তাকিয়ে দেখি৷ সাকিবের মতো ক্রিকেটার হওয়ার প্রতিজ্ঞা যদি ওরা করে, তাহলে সাফল্য পাবে৷ এটি মনে রাখতে হবে, বেশি যশ পাবার পর যেন ক্রিকেট থেকে দূরে সরে না যায়৷ এই দূরে সরে যাওয়াটাই আমার কাছে মনে হয় নিজের প্রতি অত্যাচার করা৷ সাকিবের উদাহরণ ওদের সামনে থাকলে খ্যাতির এই বিড়ম্বনা বা চাপ ওরা সামলাতে পারবে৷ -ডয়েচেভেলে

Comments